সালমানের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন: সামিরা

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম সালমান শাহ। নব্বই দশকে যার আগমন ঘটেছিল ধূমকেতুর মত। তারা হয়ে আলো জ্বালাতে এসে সবার মন জয় করে অল্পতেই নিভে যায় সালমান নামের সেই আলো।

তার অকাল প্রয়াণ মেনে নিতে পারেনি শোবিজ অঙ্গন ও তার ভক্তরা। সালমানকে হত্যা করা হয়েছে নাকি তিনি আত্মহত্যা করেছেন সেই বিষয়ে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

পিবিআইয়ের প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর এটি নিয়ে নানামুখি আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। এ নিয়ে সামিরা বলেন, শুধু এটা কেন, এর আগে চারবার বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে আত্মহত্যাই এসেছে। কারণ আমি সেই ৯৬ সাল থেকেই বলে আসছি। আমার চেয়ে তো আর বেশি কেউ জানে না। কিন্তু আমাকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ইমনের (সালমান শাহ) মা, ভাই ও কুমকুম মামা অপরাধী করেছেন।

যা তা গল্প বানিয়ে সবার সামনে আমাকে অত্যন্ত বাজেভাবে খুনি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। অনেক পরে এসে আবারও সেটাই প্রমাণ হয়েছে যা আমি বলেছি যে সালমান আত্মহত্যা করেছে। শুধু আমি নই, যারা ওইদিন ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন সবাই এটাই বলে আসছেন।

পিবিআইয়ের তদন্তে সালমান শাহ আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হয়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ‘অতি-অন্তরঙ্গতা’। এ বিষয়ে সামিরা বলেন, ‘ইমন (সালমান শাহ) ও শাবনূর প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং সেই কথা ইমন নিজেই আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু এখন শাবনূর ভিন্ন কথা বললে তো হবে না। শাবনূর যা করেছে, তাঁর কৃতকর্মের জন্য তাঁকে সরি বলতে হবে। সেটা এখন হোক কিংবা পরে, এই জীবনে কিংবা শেষ বিচারের দিনে।’

তিনি তো অনেক চেষ্টাই করলেন। কত গল্প বানালেন, আমাকে দুনিয়ার লোকের সঙ্গে প্রেম করালেন। ফটোশপের কারসাজিতে এর সঙ্গে বসালেন, ওর সঙ্গে শুয়ালেন। একটাও প্রমাণ হয়নি। কারণ মিথ্যেকে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। আমার কষ্ট হয়, কেমন করে পারলেন তিনি এতকিছু? আমি না তার ছেলের বউ ছিলাম। আমি তো সালমানের সঙ্গে সঙ্গেই বেশি সময় কাটাতাম। সিনেমার মানুষেরা তার সাক্ষী।

তাছাড়া ইস্কাটনের বাসাতে অনেক সিকিউরিটি ছিলো, কাজের লোকজন ছিলো। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এত প্রেম আমি করলাম কখন? সালমান কিছুই জানতো না? আর কেন করবো? সেই সময়ের হার্টথ্রব পুরুষটি আমার স্বামী, আর কোনো পুরুষে আমার দৃষ্টি আসবে কেন? আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে আমি চিনতাম না। নীলা চৌধুরী চিনতেন। তিনি আরও অনেককেই চিনতেন।

সালমান আমার প্রেমিক, সালমান আমার স্বামী। আজও মানুষ নায়ক সালমানকে যেমন মনে রেখেছে, আমিও আমার জীবনের সেরা মানুষটিকে মনে ধারন করে রেখেছি। যাকে এখন বিয়ে করেছি সে এটা জেনে ও মেনেই আমাকে বিয়ে করেছে। কে বিশ্বাস করলো না করলো তাতে কিছুই যায় আসে না। চিৎকার করে লোক দেখিয়ে আমার ভালোবাসা আমি কোনোদিন প্রচার করিনি।

সালমান হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি ছিলেন আপনি। এই প্রতিবেদন সেই অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছে। এটা নিশ্চয়ই স্বস্তির। সামিরার ভাষ্য, এই ২৪ বছরে যে গ্লানি, অপবাদ আমি বয়ে বেড়িয়েছি সেটা একজন নারী হিসেবে কতটা কষ্টের, কতটা অমানবিক ছিলো তা কাকে বোঝাবো? চোখের সামনে স্বামীকে হারালাম যাকে এক কাপড়ে ঘর ছেড়ে বিয়ে করেছিলাম। সেই স্বামীর খুনের অভিযোগ মাথায় নিলাম। একজন নারী হয়ে আমার শাশুড়ি আমার জীবনটাকে বিষিয়ে দিয়েছেন। এটা কি ঠিক হলো? এর বিচার কে করবে? এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিটা রাত, প্রতিটা দিন আমি নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। একটা সংসার আছে আমার, তিনটা বাচ্চা আছে। তারা হেয় হয়েছে, তাদের কাছে আমি ছোট হয়েছি। সমাজে আমি ছোট হয়েছি। সালমান ভক্তদের কাছে আমি ছোট হয়ে চলেছি। তবুও আমি ধৈর্যশালী ছিলাম। কারণ আজ কিংবা কাল, সত্যিটা সত্যিই হয়।

এবং সেটাই হয়েছে। সালমানের মা ও পরিবারের অন্যদের ষড়যন্ত্র এবং উদ্দেশ্য সবাই বুঝতে পারছে। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের পর অসংখ্য ভক্তরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তারা উপলব্ধি করছে যে সালমান সত্যি খুন হলে বারবার সেটা আত্মহত্যা হয়ে আসতো না। আমি এমন কেউ নই যে দেশের সবাইকে কিনে নেবো। এখানে এমন অনেকের বক্তব্য নেয়া হয়েছে যাদের কথা আমিও জানতাম না। এসব বিষয় সবাইকে ভাবাচ্ছে৷ সবাই সত্যটা বুঝতে পারছেন। প্রিয় নায়ক আত্মহত্যা করেছেন এটা মানতে কষ্ট হলেও তারা বাস্তবতা মেনে নিচ্ছেন। এটা ভালো লাগছে।

সালমান শাহের বাবা-মা ও ভাই গ্রিন রোডে থাকতেন। কিন্তু আপনারা ইস্কাটনে আলাদা থাকতেন। সেটা কেন? সামিরার জবাব, এই বিষয়টা আমি কখনও শেয়ার করতে চাইনি মিডিয়াতে। কারণ আমাকে ছোট করলেও আমি সালমানের মা হিসেবে নীলা চৌধুরীকে কখনো কারো কাছে ছোট করতে চাইনি। সে আমার নামে যত বাজে কথা ছড়িয়েছে আমি কিন্ত তাকে নিয়ে কোনো টিভি-রেডিওতে গিয়ে কুৎসা রটাইনি। বললে বলার শেষ হবে না। আজ যখন প্রসঙ্গটা আসলো তাই বলছি। নীলা চৌধুরী আমার গায়ে হাত তুলেছিলেন। তখন গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘স্নেহ’ ছবির শুটিংয়ে বান্দরবান ছিলো সালমান।

আমাকে মারধরের খবর পেয়ে বিনা নোটিশে একদিনের জন্য ও ঢাকায় ছুটে এসেছিলো। গাজী সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেই এটা জানতে পারবেন। আমি রেফারেন্স দিয়ে কথা বলছি। বানিয়ে নয়। সালমান ঢাকায় এসে দেখলো আমি বাসায় পড়ে কান্নাকাটি করছি। তার মা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ছেলেকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করতে। সালমান কিন্তু তার নাটক বিশ্বাস করেনি। সবার কাছে ঘটনা শুনে সে বিরক্ত হলো। এরপর আলাদা হয়ে আমাকে নিয়ে ইস্কাটনের বাসায় উঠলো।

সেখানে খুব একটা আসতেন না নীলা চৌধুরী। সবমিলিয়ে হয়তো চারবার এসেছেন। তবে আমার শ্বশুর আসতেন প্রায়ই। তিনি আমাকে খুব আদরও করতেন। মা বলে ডাকতেন। আমিও তাকে কোনোদিন অশ্রদ্ধা করিনি।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদন নিয়ে সালমানের মা আপত্তি জানিয়েছেন। এটাকে নাটক বলেছেন। তার দাবি আপনি ও পিবিআই মিলে মনগড়া নাটক বানিয়েছেন বিচারের নামে।

এ বিষয়ে কী বলবেন? সামিরার উত্তর, সালমান যদি আত্মহত্যাও করে থাকেন তবে সেটা শাবনূর এবং আপনার দোষ। নীলা চৌধুরী এমনটাই বলে আসছেন সবসময়। সামিরা বলেন, তিনি আমাকে গ্রেপ্তার দেখাতেই চান। আমাকে সরিয়ে সালমানের সবকিছু ভোগ করছেন। আমার নামে বনানীতে ফ্ল্যাট কিনেছিলো সালমান, আমাকে লাল রঙ্গের একটা গাড়ি গিফট করেছিলো বিয়েবার্ষিকীতে। সেগুলো কই? কেউ কিছু বলার নেই। ইচ্ছেমতো সব ভোগ করা যাচ্ছে। আমি এতো খারাপ হলে আমাকে ছোট ছেলেকে দিয়ে বিয়ে করিয়ে রাখতে চান কেন? একটা রেডিওতে তিনি বলেছেন, আমাকে সালমানের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে রেখে দিতে চেয়েছিলেন। আমি তো খারাপ। তাহলে কেন এমনটা ভাবেন। আর সালমানের ছোটভাই আমার পাঁচ বছরের ছোট। তিনি কেমন করে এ ধরনের ভাবনা ভাবেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*